রাজা

সুদর্শনা। রাজাকে তখন তোর কী মনে হত।

সুরঙ্গমা। উঃ, কী নিষ্ঠুর! কী নিষ্ঠুর! কী অবিচলিত নিষ্ঠুরতা!

সুদর্শনা। সেই রাজার ’পরে তোর এত ভক্তি হল কী করে।

সুরঙ্গমা। কী জানি মা! এত অটল, এত কঠোর ব’লেই এত নির্ভর, এত ভরসা। নইলে আমার মতো নষ্ট আশ্রয় পেত কেমন করে।

সুদর্শনা। তোর মন বদল হল কখন।

সুরঙ্গমা। কী জানি কখন হয়ে গেল। সমস্ত দুরন্তপনা হার মেনে একদিন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তখন দেখি, যত ভয়ানক ততই সুন্দর। বেঁচে গেলুম, বেঁচে গেলুম, জন্মের মতো বেঁচে গেলুম।

সুদর্শনা। আচ্ছা সুরঙ্গমা, মাথা খা, সত্যি করে বল্‌ আমার রাজাকে দেখতে কেমন। আমি একদিনও তাঁকে চোখে দেখলুম না। অন্ধকারেই আমার কাছে আসেন, অন্ধকারেই যান। কত লোককে জিজ্ঞাসা করি, কেউ স্পষ্ট করে জবাব দেয় না। সবাই যেন কী-একটা লুকিয়ে রাখে।

সুরঙ্গমা। আমি সত্যি বলছি রানী, ভালো করে বলতে পারব না। তিনি কি সুন্দর— না, লোকে যাকে সুন্দর বলে তিনি তা নন।

সুদর্শনা। বলিস কী! সুন্দর নন?

সুরঙ্গমা। না রানীমা! সুন্দর বললে তাঁকে ছোটো করে বলা হবে।

সুদর্শনা। তোর সব কথা ঐ এক-রকম। কিছু বোঝা যায় না।

সুরঙ্গমা। কী করব মা, সব কথা তো বোঝানো যায় না। বাপের বাড়িতে অল্প বয়সে অনেক পুরুষ দেখেছি, তাদের সুন্দর বলতুম। তারা আমার দিনরাত্রিকে, আমার সুখদুঃখকে কী নাচন নাচিয়ে বেড়িয়েছিল সে আজও ভুলতে পারি নি। আমার রাজা কি তাদের মতো? সুন্দর! কক্‌খনো না।

সুদর্শনা। সুন্দর নয়?

সরঙ্গমা। হাঁ, তাই বলব— সুন্দর নয়। সুন্দর নয় ব’লেই এমন অদ্ভুত, এমন আশ্চর্য। যখন বাপের কাছ থেকে কেড়ে আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেল তখন সে ভয়ানক দেখলুম। আমার সমস্ত মন এমন বিমুখ হল যে, কটাক্ষেও তাঁর দিকে তাকাতে চাইতুম না। তার পরে এখন এমন হয়েছে যে যখন সকালবেলায় তাঁকে প্রণাম করি তখন কেবল তাঁর পায়ের তলার মাটির দিকেই তাকাই, আর মনে হয়— এই আমার ঢের, আমার নয়ন সার্থক হয়ে গেছে।

সুদর্শনা। তোর সব কথা বুঝতে পারি নে, তবু শুনতে বেশ ভালো লাগে। কিন্তু যাই বলিস, তাঁকে দেখবই। আমার কবে বিবাহ হয়েছিল মনেও নেই; তখন আমার জ্ঞান ছিল না। মা’র কাছে শুনেছি তাঁকে দৈবজ্ঞ বলেছিল, তাঁর মেয়ে যাঁকে স্বামীরূপে পাবে পৃথিবীতে তাঁর মতো পুরুষ আর নেই। মাকে কতবার জিজ্ঞাসা করেছি, আমার স্বামীকে দেখতে কেমন। তিনি ভালো করে উত্তর দিতেই চান না; বলেন, আমি কি দেখেছি— আমি ঘোমটার ভিতর থেকে ভালো করে দেখতেই পাই নি। যিনি সুপুরুষের শ্রেষ্ঠ তাঁকে দেখব এ লোভ কি ছাড়া যায়!

সুরঙ্গমা। ঐ-যে মা, একটা হাওয়া আসছে।

সুদর্শনা। হাওয়া? কোথায় হাওয়া।

সুরঙ্গমা। ঐ-যে গন্ধ পাচ্ছ না?